পপুলিজম এক মারাত্মক ব্যাধি
২৪-এর পর জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, পপুলিজমের বিস্তার এবং বিপ্লবের অপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষার দায় নিয়ে কিছু কঠিন প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই সেই প্রজন্মকে তার কাঙ্ক্ষিত রাজনীতি দিতে পেরেছি?

২৪-এর পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম নিয়েছিল, তার অন্যতম বিরোধী ভূমিকায় পপুলিজমকে একটা মারাত্মক ব্যাধি হিসেবেই দেখেছি।
সারাজীবন অরাজনৈতিক থাকতে চাওয়া যে ছেলেটা ২৪ দেখে রাজনীতিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, আমরা সেই ছেলেটাকে কিছুই দিতে পারিনি। এই ব্যর্থতার দায় অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকটা নেতৃত্বের।
টিভি-সিরিয়াল আর সিনেমার গসিপ বাদ দিয়ে যে জেনারেশন রাজনৈতিক আলাপে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, সেই জেনারেশনকে আমরা রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করতে পারিনি। বিপ্লবের পূর্ণ অর্থ এখন অনেকেরই ধারণা বা আলোচনার বাইরের বিষয়।
ফলত, এই প্রজন্মের এখন মাইকের সামনে গলাবাজি শুনতে ভালো লাগে। জুলাইয়ের কিছু বাস্তবায়িত হোক আর না হোক, "জান দেব, জুলাই দেব না" শুনতে ভালো লাগে।
দেশের অর্থনৈতিক সংকট, অলিগার্কদের প্রভাব বিস্তার আর শত শত কালোবাজারির সিন্ডিকেট নিয়ে প্রশ্ন না তুলে কেন তারা কেবলই ইনকিলাব জিন্দাবাদ কিংবা সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান দিয়েই পূর্ণ বিপ্লবকে ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারছি বলে মনে করছে, তা আশা করি অনেকটাই স্পষ্ট।
নিপীড়িত জনগণের বাংলায় যে এখনও না খেয়ে মারা যাওয়া মানুষ রাস্তায় পাওয়া যায়, এই ব্যর্থতার দায় কি কারওই নেই? হাসপাতালের চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে যেই মানুষগুলো ডাক্তারের কাছে যান না, তাকে আপনি দেশের মাথাপিছু আয় যত হাজার ডলারই বলেন কিংবা সারাদিন দিল্লি না ঢাকা স্লোগানে ছেয়ে ফেলুন শহরের অলিগলি আপনার সফলতা তার কাছে কি অর্থ বহন করতে পারে?
যেই মেয়েটা পড়াশোনা বা পরিবারের খরচ চালানোর জন্য অশ্লীল ভিডিও বানাচ্ছে কিংবা শরীর বিকিয়ে দিচ্ছে, আজকে তার এই পরিস্থিতির দায়ভার কি মঞ্চ কিংবা মন্ত্রিসভার আসনে বসে থাকা কারওই নেই?
নেতারা জনগণের টাকায় কোটিপতি হয়ে এলাকায় দান-খয়রাতের মতো আয়রনি করে বেড়ায়। এটা এখনও সকলেরই পছন্দ। তবে "রাজনৈতিক ভিক্ষা না নিয়ে নিজেদের অধিকারটুকু আদায়ে সচেতন হলে এই দুর্দিন ইনশাআল্লাহ কেটে যাবে" বলা ব্যক্তিকে সমাজ পছন্দ করে না। এই পছন্দ না করার দায়টাও আমাদেরই।
পপুলিজম ওয়েলফেয়ার পলিটিক্সকে সর্বদাই প্রশংসিত করে। কিন্তু অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের আলাপটুকু নির্বাচনী ইশতেহার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ইতিহাস লিপিবদ্ধ হতে থাকে তার আপন গতিতে। দিনে ন্যায়-ইনসাফের কথা বলে যারা রাতে অসহায়ের মাথা কাটে, তাদের কেউ মজলুম নয়।
নারায়ে তাকবির স্লোগান দিয়ে আমি ইসলামের জন্য দেশে কী করতে পেরেছি? আমি সীমান্ত মানি না, তবে আমি দুই বাংলার মুসলমানদের জন্য কী করতে পেরেছি? যখন আমার সুযোগ ছিল অপশক্তি কর্তৃক হওয়া ইতিহাসের বিকৃতিকে সংশোধনের, তখন আমি লড়াই করেছি নামাজে হাত বুকের উপরে বাঁধা হবে না নিচে, আমিন উচ্চস্বরে বলব না নিম্নস্বরে।
বাম-মধ্য-ডান কনসেপ্টের বাইরে গিয়ে আমরা দেশের সার্বভৌমত্বের দিকে তাকানোর সময় পাই না, কারণ আমি দেশের অর্থনীতির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে ভাবলে আমার ফেসবুকে ফলোয়ার বাড়বে না। কারণ আমি আমার প্রতিপক্ষ মনে করি খোদ আরেক বাঙালিকেই।
পশ্চিম আর পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যকার পার্থক্য হিসেবে আমি ইলিশ মাছের ভাগ-বাটোয়ারা আর একটা মাছের দশটা ভাগ করে খাওয়া নিয়ে মাতামাতি করি। মাঝখানের একটা কাঁটাতার যে দুই কেন্দ্রের সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যকার প্রকৃত বিভেদটা আসলে কী ছিল বা আছে, তা নিয়ে আমরা ভেবেছি?
আমরা ভেবেছি জুলাইয়ের নেতারা কেন নতুন রাজনৈতিক সংগঠন শুরু করবে। আমরা ভেবেছি তারেক রহমানের একশ টাকার খাবারের খরচ নিয়ে। আমরা ভাবিনি কেন খালেদা জিয়াকে এত মানবেতর জীবনের মধ্য দিয়ে যেতে হলো। শেখ হাসিনা কীভাবে এত শক্তিশালী হলো। কেনই বা জুলাই-পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের নেতাদের নামে মামলা দায়ের করা সম্ভব! কেনই বা অভ্যুত্থানের সকল শক্তিকে জুলাইয়ের পর মব কমিউনিটি হিসেবে চিত্রিত করা হলো!

Mahfuzur Rahman
More about the author →